আমপাতা জোড়া জোড়া-শিশুদের নিরীহ খেলার আড়ালে লুকানো আছে ভয়!

'আমপাতা জোড়া জোড়া / মারব চাবুক, চড়ব ঘোড়া।ওরে বিবি সরে দাঁড়া / আসছে আমার পাগলা ঘোড়া।পাগলা ঘোড়া খেপেছে / বন্দুক ছুড়ে মেরেছে…'

শৈশবে খেলতে খেলতে হাততালি দিয়ে এই ছন্দে মেতে উঠা হয়। এক দেখায় মনে হয় এক মজার খেলার গান। কিন্তু ইতিহাসে খোঁজ নিলে দেখা যায়-'পাগলা ঘোড়া', 'চাবুক', 'বন্দুক'-সবই কলকাতার মাউন্টেড পুলিসের দাপট ও ব্রিটিশ আমলের সামাজিক স্মৃতিকে তুলে ধরে। শিশুদের নিরীহ খেলার আড়ালে লুকানো আছে ভয়, শাস্তি এবং ঔপনিবেশিক দমননীতির দীর্ঘ ছায়া। আর এই গল্প কম বেশি প্রায় অনেকেই জানেন না। 

কলকাতা পুলিস কমিশনারেট গঠিত হয় ১৮৫৬ সালে, কিন্তু তার অনেক আগেই, ১৮৪০ সালে, শহরে তৈরি হয় অশ্বারোহী পুলিস বাহিনী। মূল উদ্দেশ্য ছিল শহরের রাস্তায় বেআইনি কার্যকলাপ ও দাঙ্গাহাঙ্গামা নিয়ন্ত্রণ করা। প্রথমে ছিল মাত্র তিনটি ঘোড়া। কিন্তু ১৮৪২ সালে ময়দানে ঠগ, চোর, এবং কোম্পানির সৈন্যদের উৎপাত বেড়ে গেলে সংখ্যা বাড়িয়ে বারো ঘোড়া করা হয়। নেতৃত্বে ছিলেন একজন জমাদার ও একজন দফাদার। তাঁদের পোশাকও ছিল অদ্ভুত, যা সেই সময়ের প্রায় অনেকেই দেখেননি। তাঁদের গাঢ় সবুজ চাপকান, সাদা পায়জামা ও বুট, লাল পাগড়ি, কোমরে খাপে মোড়া পিস্তল এবং দশ রাউন্ড গুলি দেখে সেই সময়ের লোকেরা ভয় পেতেন। এখানেই শেষ নয়, তাঁরা অবাধে নির্যাতন চালাতেন সাধারণ মানুষের ওপর। আর এরপরই লোকমুখে তৈরি হয়েছিল এই ধরণের ছড়া। আরও একটা কবিতা সেই সময়ে বহুল প্রচলিত ছিল, কিন্তু যুগের হাওয়ায় তা ধীরে ধীরে প্রায় বিলুপ্তি প্রায়। সেটা হল- 'লাল পাগড়ি বেঁধে মাথে / রাজা হলে কলকাতাতে।' শহরের অপরাধীরা এই দাপটের কারণে ভয়ে সিঁটিয়ে থাকত। 

সে সময়ে তাঁরা যে ঘোড়া নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, সেইসব ঘোড়ার রঙ ছিল বিভিন্ন-সাদা, কালো, বাদামি। তাদেরকে ভালোভাবে যত্ন করা হত, যা সেই সময়ের মানুষেরা পেত না। এমনকি সেই ঘোড়াকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হত। ঘোড়াগুলোর ঘাড়ে ছিল ফোলা আর মসৃণ লোম। তাদের পিঠে করে সাওয়ার করার সময় পিস্তল নিয়ে যেত। এই বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অপরাধীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিত। একসময় তাদের দক্ষতাকে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মাউন্টেড পুলিসের সঙ্গে তুলনা করা হতো। ইতিহাস বলছে, ১৮–১৯ শতকে বিশ্বের সেরা তিনটি ঘোড়সওয়ার পুলিস বাহিনীর মধ্যে ছিল লন্ডন, মন্ট্রিয়ল এবং কলকাতা।ছড়ার 'আমপাতা' অংশটি শুভতা ও সুরক্ষার প্রতীক। কিন্তু 'মারব চাবুক চড়ব ঘোড়া' অংশটি ভয়ের প্রতীক। ১৮–১৯ শতকের বাংলায় জমিদারি ছিল কঠোর। কর দিতে না পারলে বা বিরোধ করলে জনসমক্ষে শাস্তি দিতেন তাঁরা। সে সময়ের রেওয়াজ ছিল চাবুক মারা বা ঘোড়ার সঙ্গে হাঁটানো। যা সত্যিই এই ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে ভাবলেই আমাদের গায়ের লোম খাঁড়া হয়ে ওঠে। সাধারণত, এদের উদ্দেশ্য ছিল অন্যদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করা, শিশুরা এই ভয়ের স্মৃতিকে খেলার ছড়ার আকারে রূপান্তরিত করেছে। 

এই ব্যাপারে বিশদে জানতে নিচের লিংকটি ক্লিক করুন সেই সঙ্গে সাবস্ক্রাইব করুন Bengal Fusion News Time.

অনুলিখন: 
Oindrila Chakraborty
ll